সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
সুনামগঞ্জে সুদখোর ও দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ অনেক মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা যায় বিগত এক বছরে বেপরোয়া সুদখোরদের যন্ত্রণায় ফেসবুকে স্ট্যটাস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন একজন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানসহ দুই ব্যক্তি। এছাড়া বাড়ি ছাড়া হয়েছেন বহু ব্যবসায়ী। জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুদখোরেরা অপেক্ষাকৃত নিরীহ ও সভ্রান্ত মানুষদের টার্গেট করেই সুদের জাল তৈরি করে। এছাড়াও কৃষক, জল মহাল ব্যবসায়ী, মাছের ব্যবসায়ী, বিদেশী যেতে ইচ্ছুকসহ ঠিকাদার, বিভিন্ন ব্যবসায়ী, সরকারি চাকুরিজীবী ও প্রবাসীদের কাছ থেকে ব্ল্যাঙ্ক চেক এবং সাদা স্টাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে টাকা দেয় তারা। সুদের এই মহাজনদের দালাল আছে মহল্লায় মহল্লায়, এরা সুদখোর মহাজনদের হয়ে সুদে ঋণ দেবার জন্য এলাকায় এলাকায় কাজ করে। কিছু কমিশনের বিনিময়ে।
জেলার অনেক এলাকায় এমনও উদাহরণ আছে পাঁচ লাখ টাকা সুদে দিয়ে ২৮ লাখ, ৩০ লাখ টাকার পাওনা দাবি করে আদালতে চেক ডিজঅনার অ্যাক্টে মামলা দায়ের করে টাকা আদায় করেছে। এ কারণে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন কেউ কেউ।
সৌম্য চৌধুরী মৃত্যুর একদিন আগে (পহেলা জুন) তার ফেসবুক আইডিতে লিখেন ‘আমার এমন পরিণতির জন্য দায়ী দিরাইয়ের হবিবুর রহমান এবং জসিম উদ্দিন, হবিবুরের কাছ থেকে আমি টাকা এনেছিলাম। তা সুদ করেছি দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র মোশারফ মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে। এরপর আমি অসুস্থ্য হয়ে পড়ি, সুস্থ্য হয়ে জানতে পারি, ওদের টাকার জন্য আমার উপর মামলা হয়ে গেছে। ওদের টাকার জন্য আমি পথে বসেছি। হবিবুর একজন নিচু সুদখোর। সুদের টাকায় দিরাইয়ে তিনটি বাড়ী করেছে সে।’জসিম উদ্দিন নামে আরেক জনের নামোল্লেখ করে তিনি বলেন, সে ২৯ লাখ টাকা কোথা থেকে পেলো তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে।
তিনি এই দুই সুদখোরসহ দিরাই কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সজল দাস, অসিত দেব নাথ, চিনি ঠাকুর ও পুতুল দাসের নামোল্লেখ করে লিখেন, ওরা সুদের ব্যবসা করে মানুষকে বিপদে পড়লে শতকরা ১০ টাকা হারে সুদে টাকা লাগায়। তিনি ওদের বিচারও দাবি করেন।
এই ঘটনার পর সৌম্য চৌধুরী’র স্ত্রী ইলা চৌধুরী বাদী হয়ে গেল ১৭ জুলাই দিরাই পৌর এলাকার ধল পয়েন্টের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান হবু, জসিম উদ্দিন এবং রাজনাগরের সুজন দাস, পুতুল দাস এবং অমিত দেব নাথের উপর আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন। এই মামলার আসামী হাবিবুর রহমান হবু ও জসিম উদ্দিন উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বীরদর্পে ঘুরছেন। অন্য তিন আসামী এখনও পলাতক রয়েছে।
এর আগে গেল ১৮ আগস্ট নিজের ফেসবুক আইডিতে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করে ফয়সাল আহমদ সৌরভ (৩০) নামের এক যুবক। সে তাহিরপুরের পাতারি গ্রামের আজিজুর রহমানের ছেলে। মৃত্যুর আগে ফেসবুক স্ট্যটাসে সে লিখে, ‘আমি গলায় দড়ি দিলাম তুই রফিকের লাগি, তুই আমারে কাবু করি লাশ বানাইলি, সফিকের কাছ কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা আনছিলাম সুদে, তিন লক্ষ টাকা সুদ দিয়ে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা এখনও পায়, এই রফিক আর সফিকের লাগি আত্মহত্যা করলাম।’
এই ঘটনার পরও আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা হয়। এই মামলার আসামীরাও জামিনে রয়েছে।সুদখোরদের যন্ত্রণা আছে গ্রামে-গঞ্জে। পাঁচ মাস আগেও তাহিরপুরের টেকাটুকিয়া গ্রামের ধীরাজ রায় চৌধুরী’র সঙ্গে সূর্যেরগাঁওয়ের নুরুল ইসলামের সুদের টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে এলাকায় সালিস বসে। কিন্তু নুরুল ইসলাম আদালতে এনআই (চেক ডিজঅনার) অ্যাক্টে মামলা করায় সেই বিষয়টিও আপোসে নিস্পত্তি হয়নি।
তাহিরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানান, সালিশ কারকদের ধীরাজ জানিয়ে ছিলেন, দুই লাখ টাকা নিয়ে পাঁচ লাখ টাকা দেবার পরও নুরুল ইসলামের কাছে ব্ল্যাঙ্ক চেক থাকায় সাত লাখ টাকা পাওনার মামলা করেছেন। আমিনুল ইসলাম জানান, নুরুল ইসলাম সালিশ কারকদের কাছেই দাবি করেছেন, তিনি কেবল সুদের টাকা পেয়েছেন, শেষ পর্যন্ত তার সুদে আসলে সাত লাখ হয়েছে, সেই টাকা দিতে হবে। বিষয়টি পরে সালিশে সমাধান হয়নি।
এমন ঘটনা গ্রামাঞ্চলে প্রায়ই ঘটছে। গেল মে’র শেষ সপ্তাহে দোয়ারাবাজার উপজেলার রাকেশ চন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সুদেবী রানী সরকারের মেয়ে প্রিয়াংকা রানী দাস দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, তার বাবা ইউনিয়ন পরিষদ সচিব প্রিয় মোহন দাস হঠাৎ করে মৃত্যুবরণ করলে তিন সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন তার মা সুদেবী রানী সরকার। ভাই বোনদের পড়াশুনা, সংসার খরচ চালানো ছাড়াও মা’র চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তার মা। শেষে মান্নারগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সহায়তায় দোয়ারাবাজার সনাতন শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লি.’এর অফিসে আসেন তিনি। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে ওই সমিতির সভাপতি রিংকু দেব অগ্রণী ব্যাংকের দোয়ারাবাজার শাখার দুটি চেক নিয়ে তার মাকে মাসে শতকরা সাত টাকা সুদে দুই লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা নগদ তুলে দেন। ওই সময় ২০ হাজার টাকা সমিতির তহবিলে তার নামে জমা রাখা হয়েছে বলে জানান। উত্তোলনের পরপরই টাকা তুলতে মধ্যস্ততাকারী শিক্ষক এক লাখ টাকা নিয়ে যান। ওই এক লাখ টাকার সুদ ও আসল তিনি (ওই শিক্ষক) দেবেন বলে টাকা নেবার সময় বলেছিলেন। পরে তিনি আর টাকা দেননি।
২০২১ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে তার মা সুদেবী রানী সরকার নিজের ভাগের এক লক্ষ টাকার সুদসহ আসল পরিশোধ করেন। কিছুদিন পর রিংকু দেব তার মায়ের কাছে উকিল নোটিশ পাঠান ঋণের কিস্তি দেবার জন্য। ওইসময় মাকে সঙ্গে নিয়ে সনাতন শ্রমজীবী সমবায় সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে ১৫ হাজার টাকা সুদের কিস্তি দিয়ে আসেন তারা।
এর কয়েকদিন পরই তার মাকে খবর দিয়ে নিয়ে সাদা স্টাম্পে স্বাক্ষর রাখেন রিংকু দেব। এখন বলছেন, তার মায়ের কাছে তিনি পাঁচ লাখ টাকা পান। উকিল নোটিশও পাঠিয়েছেন তিনি। এই অবস্থায় তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই বিষয়ে সুষ্ঠু প্রতিকারের জন্য দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত আবেদন জানান তারা। এই বিষয়টিও এখনো শেষ হয়নি।
সনাতন শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লি.’এর সভাপতি রিংকু কুমার দেব তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে বলেছেন, অভিযোগের কোনটাই সত্য নয়। সুদেবী রানী সরকার সনাতন শ্রমজীবী সমবায় সমিতি থেকে নয়, আমার ব্যক্তিগত ব্যবসা থেকে পাঁচ লাখ টাকা বিনা সুদে চেক দিয়ে হাওলাত নিয়েছেন। প্রথম আমি তার কাছ থেকে স্টাম্পে স্বাক্ষর নেইনি। তিনি যখন কথা দিয়ে কথা কয়েকবার রাখতে পারেন নি, তখন স্টাম্পে সবকিছু লিখে স্বাক্ষর নিয়েছি।
দিরাই থানার ওসি মুক্তাদীর আহমদ বললেন, দিরাইয়ে বিট পুলিশের মাধ্যমে সুদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি’র চেষ্টা করছেন তারা। ইতোমধ্যে উপজেলার রাজানগর ও কুলঞ্জ ইউনিয়নে সভা করা হয়েছে। ওখানে মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিত সুদ দাতা গ্রহিতাদের কুফল নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক’এর) সভাপতি দুদক’র পিপি আইনুল ইসলাম বাবলু বললেন, আদালতে এখন এনআই (চেক ডিজঅনার) অ্যাক্টের মামলা বেড়েছে। সুদখোররা ব্ল্যাংক চেকে বেশি টাকা লিখে রেখে এসব মামলা করছে। এই বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন। সুদখোরদের সামাজিভাবে বর্জন করা জরুরি। এরা সহজেই কোটি টাকার মালিক বনে যায়। আয়করও দেয় না। এমনি তাদের টিআইএনও নেই। সম্পদ বিবরণির কোন হিসাব নিকাশ কোথাও দেয় না এরা। এই বিষয়ে আয়কর বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং প্রশাসনের নজরদারী বাড়ানো প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বললেন, সুনামগঞ্জে যোগদান করার পর থেকেই অপ্রতাষ্ঠিনিক সুদের ব্যবসা নিয়ে কথা শুনছি আমি। এজন্য গেল ঈদের আগের আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় এবং ঈদ পরবর্তী বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলেছি আমরা। এছাড়া হঠাৎ একজন ব্যক্তি কীভাবে প্রকাশ্য কোন ব্যবসা ছাড়াই, টিআইএন ছাড়াই অন্যকে এতো টাকা ঋণ দেয়, টাকা পায় কোথায়, পরে আবার মামলাও করে, এই বিষয়গুলো আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দেখার জন্য চিঠি দেবার চিন্তা করছি আমি।
Leave a Reply