অষ্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ
অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডাঃ হাসনা ফারুকীর বদলীতে অশ্রুসিক্ত অষ্টগ্রামের অধিকাংশ নারী। সম্প্রতি তিনি উচ্চশিক্ষা জনিত কারণে সহকারী রেজিষ্টার হিসেবে বদলী হয়েছেন কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
জানা যায় ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী তিনি সহকারী সার্জন পদে অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেছিলেন। এরপর থেকে হাওরের প্রান্তিক জনগোষ্টীকে তিনি নিরলস ভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন। অনেকের হৃদয়ে তিনি স্থান করে নিয়েছিলেন একজন জনবান্ধব মমতাময়ী চিকিৎসক হিসেবে।
বিশেষ করে তিনি ছিলেন হাওরের অসহায় নারীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। তিনি চলে যাওয়াতে হতাশায় ভূগছেন অষ্টগ্রামের নারীরা।
এর সত্যতা মেলে সেদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে গিয়ে। দু’জন নারী ঘুরছেন পাগলের মত উঁকিঝুকি মারছেন বিভিন্ন কক্ষে। কাকে যেন খুঁজছেন। জিজ্ঞাসা করতেই জানালেন ডাঃ হাসনা ফারুকীর কথা। তিনি বদলী হয়ে চলে গেছেন জানাতেই সুরমা আক্তার (২৪) নামে একজন জানালেন, তিনি ভাল একজন ডাক্তার ছিলেন। আমি যতবার তার কাছে এসেছি ততবারই তিনি অত্যন্ত যত্ন সহকারে পরম মমতায় আমার ও বাচ্চাদের চিকিৎসা করেছেন। আমি তার বদলির খবর পেয়ে শেষ দেখাটা করতে এসেছিলাম। কিন্ত আমার শেষ আশাটি পূর্ণ হলোনা বলেই টিসু দিয়ে চোখ মুছলেন তিনি।
জান্নাতুল ফেরদৌস (২৫) নামে অপর মহিলা জানালেন, আমার বৃদ্ধা মা অসুস্থ থাকা অবস্থায় মাতৃস্নেহে তিনি আমার মায়ের চিকিৎসা করে সুস্থ্য হতে সহযোগিতা করেছেন। আমি তাকে বিদায় জানাতে এসেও পাইনি। কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, ডাঃ হাসনা ফারুকীর মত চিকিৎসক আবার অষ্টগ্রামে আসবেন কিনা আমি জানিনা। আল্লাহ তাকে ভাল রাখুন।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও প্রায় আড়াই লক্ষাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত এক হাওর জনপদ কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলা। এই বৃহত্তর জনগোষ্টীর স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র আশ্রয়স্থল অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স। ২০১৩ সালে এ হাসপাতালটি ৩১শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবলের অভাবে দশ বছর পরেও ৩১ শয্যার জনবল নিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এ হাসপাতালটি। এখানে কোন চিকিৎসক এসে থাকতে চাননা। যেখানে কোন চিকিৎসক যোগদানের আগেই বদলীর চিন্তা মাথায় নিয়ে এখানে আসেন সেখানে ডাঃ হাসনা ফারুকী যোগদানের পর থেকে নিরলস ভাবে কাজ করে গেছেন দীর্ঘ সময়।
হাওরের নিরন্ন মানুষের সাথে মিশেছেন আপন জনের মত। তিনি এখানে নরমাল ডেলিভারী থেকে শুরু করে রোগীদের সকল স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন ঠিক মাতৃস্নেহে। তিনি এখানে শুধু একজন চিকিৎসকই ছিলেননা তিনি খেলাধুলাসহ একাধারে একজন ভাল উপস্থাপিকা, ভাল গায়িকাও ছিলেন। এজন্য বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণেও ছিল তার পদচারনা। তাই তার এ বদলিতে উপজেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গণেও বিরাজ করছে নিরব শূন্যতা।
রুহুল আমিন নামে একজন তার ফেসবুক কমেন্টে ডাঃ হাসনা ফারুকী সম্পর্কে লিখেছেন-আপনার বিদায়ে অষ্টগ্রামবাসী উদার মনের একজন মানবিক ডাক্তার হারাচ্ছেন। আপনার তুলনা আপনি নিজেই। আপনার আত্মত্যাগ ও সেবা অষ্টগ্রামবাসী কোন দিনও ভুলবে না। আপনার এই নতুন পোস্টিং এর খবরটা যেন মনের ভিতর কোন মহা-মূল্যবান সম্পদ হারানোর হাহাকার সৃষ্টি করে দিয়েছে। আপনার সেবা, আচার-ব্যবহার, দিক-নির্দেশনা গুলো সম্পর্কে লিখতে গেলে লিখে শেষ করতে পারবনা।
এবিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুল্লাহ-আল- শামীম এ প্রতিনিধিকে জানান, আমি হাসনা ফারুরীর সাথে মাত্র ২০দিন কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এ সময়টাতে সকল কাজেই আমি তাকে পাশে পেয়েছি। নরমাল ডেলিভারীতে তিনি সর্বোচ্ছ সময় নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ করেছেন । আমি বিজয়ের মাসের আগেই অষ্টগ্রামে ওটি চালু করতে চাই। এসময়ে তার মত একজন আন্তরিক ও অভিজ্ঞ চিকিৎসককে আমার সহকর্মী হিসেবে পেলে আমি যেমন উপকৃত হতাম তেমনি উপকৃত হত অষ্টগ্রামের সাধারণ মানুষ।
এ বিষয়ে ডাঃ হাসনা ফারুকী এ প্রতিনিধিকে বলেন, যদিও প্রথম দিকে হাওরে আসতে ভয় পেতাম কিন্তু এখন আমি হাওরের মায়ায় পড়ে গেছি। হাওর ছেড়ে এখন আর যেতে ইচ্ছে করছেনা শুধু উচ্ছ শিক্ষা জনিত কারনে, আমার ক্যারিয়ারের স্বার্থে এ বদলী মেনে নিতে হচ্ছ। এফসিপিএস শেষ করে বড় কোন পদে গিয়ে আবারও এই হাওরে এসে, হাওরবাসীর সেবায় নিজকে বিলিয়ে দেবার ইচ্ছা রাখি। এজন্য আমি সকলের দোয়া চাই।
.
Leave a Reply