1. admin@zisantv.com : Alim Uddin : Alim Uddin
শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০৯:১৫ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজঃ
বগুড়া সিটি করপোরেশন ছাড়াও নতুন ৫টি উপজেলা গঠন করেছে সরকার সিলেটের পাথর কোয়ারি ইজারা প্রদানে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কানাইঘাটের রুহেল ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত কানাইঘাটে ১৫৮ পিস ভারতীয় কম্বল সহ ট্রাক চালক আটক : মামলা দায়ের কানাইঘাটের বড়বন্দ তৃতীয় খন্ড গ্রামে গৃহবধূ হত্যার ঘাতক স্বামীকে খোঁজছে পুলিশ কানাইঘাটে ড. জাকি মোস্তফা টুটুলের সহযোগিতায় বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা প্রদান কানাইঘাটের সাতবাঁক ঈদগাহ প্রাঙ্গনে চিরনিদ্রায় শায়িত ভাষাবিদ ইসমাঈল আলম কানাইঘাটে ডাক্তার মুজাম্মিল আলী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ ১৯৭১ কানাইঘাটে যুদ্ধ করে সাহস ও বীরত্বের জন্য যারা বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হন শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের সুযোগ পেল শাহীন আহমদ

জীবন্ত কিংবন্তি বাউল ক্বারি আমির উদ্দিন আহমদের ৮১তম জন্মদিন পালিত

  • প্রকাশের সময় শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪
  • ২৫৫ বার পড়েছে

অনলাইন ডেস্ক :: লোক সংগীতকে যারা সমৃদ্ধ করেছেন,যাদের রচনা ও গায়কিতে জমে উঠতো বাউল গানের আসর,তাদের মধ্যে একজন জীবন্ত কিংবদন্তি হলেন বাউল ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদ। বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ বাউলদের মধ্যে তিনি প্রথম সারির একজন। তার লেখা গান করেননি এমনবাউলগানের শিল্পী খুবই কম। কমবেশি প্রত্যেক বাঙালিই তার রচিত গান শুনেছেন।

বর্তমান বাংলাদেশের নবপ্রজন্মের চাইতে ইউরোপে বসবাস রত বাঙালিদের কাছে তিনি অধিক জনপ্রিয়। কারণ হলো, দীর্ঘ সময় থেকে আমাদের কাছে না-বলা কোনো অভিমানে প্রবাসেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এই বাউল সাধক। যদি তিনি দেশে থাকতেন,তাহলে তাঁর শিষ্য-ভক্তদের অভাব হতো না। লিখিত গানের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক।

আজ (২০ ফেব্রুয়ারি) ক্ষণজন্মা এ মহাপুরুষ ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদের ৮১তম জন্মদিন। এদিনে তার জন্য ফুলেল শুভেচছা ও শুভ কামনা। ১৯৪৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাত সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার উত্তরখুরমা ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। পিতার নাম শাহ মুহাম্মদ রুস্তম আলী শেখ, মাতার নাম আলিফজান বিবি।

ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদের লেখাপড়ার হাতেখড়ি গ্রামের আলমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এখানে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন তিনি। পরবর্তীকালে ইসলামিক জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে বেশ-কতেক গুলো মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো স্থানেই মন স্থির করতে পারেননি। অবশেষে দ্বীনেরটুক মাদ্রাসা, সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা ও সৎপুর কামিল মাদ্রাসায় কিছুকাল লেখাপড়া করেন। এই সময় দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী হতে “ক্বারীয়ানা” পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং তখন থেকেই নামের শুরুতে “ক্বারী” টাইটেল যুক্ত হয়।

দেশে থাকাকালীন তিনি ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদ নামেই পরিচিত ছিলেন। তখন তাঁর নামের সঙ্গে বাউল, ক্বারী, সাধক ইত্যাদি যুক্ত ছিল না। পেশা হিসেবে ইমামতি শুরু করেছিলেন ছাতকের দোলারবাজার ইউনিয়নের শেরপুর গ্রামের একটি মসজিদে। মসজিদের মক্তবে শিক্ষার্থীদের আরবি পড়াতেন। এসময় এলাকার আনুজানী গ্রামের বাউল ভক্ত মরহুম শানউল্লাহ ও মরহুম রাশিম উল্লাহ মালদারের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি হয় তাঁর। মরহুম রাশিম উল্লাহ’র সন্তান মুজিবুর রহমান মালদারও ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদের নিকট বাইয়্যাত নিয়েছেন।

ক্বারী আমীর উদ্দিন আহমেদ বাইয়্যাত গ্রহণ করেন সিল সিলায়ে ফুলতলীর অন্যতম খলিফা, দিরাই উপজেলার উসনপুরস্থ পীর শাহ মুহাম্মদ আনাছ আলী (র)-এর নিকট। তিনিই ছিলেন ক্বারী সাহেবের মুর্শিদ বা গুরু। তাঁর পিতা-মাতা প্রদত্ত নাম ছিল রওশন আলী। অধিকাংশ জীবনীকারদের মতে ‘আমীর উদ্দিন’ তাঁর মুর্শিদ প্রদত্ত নাম। কেউ কেউ বলেন তাঁর আসল নাম ছিল মো. আমিরুল ইসলাম। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ লোকদের মুখে এখনো প্রচলিত আছে,আমির উদ্দিন নামটি প্রদান করেছিলেন বাউল সাধক দুর্বিন শাহ।

আমির উদ্দিন আহমদের পূর্বসুরীরা ফকিরি ধারার লোক ছিলেন,তাই তার রক্তের সাথে ফকিরি টান বংশগত বলা যায়। পিতামাতা উভয়ই ছিলেন সংগীত-অনুরাগী। দশ বছর বয়স থেকেই পিতার অনুপ্রেরণায় গান গাওয়া শুরু হয়। তিনি এতটাই মেধাবী ছিলেন যে,কোনো গান একবার শ্রবণ করলেই মস্তিষ্কে গেঁথে যেতো, যা তিনি আর ভুলতেন না। তাছাড়া শৈশব থেকেই এই সাধকের বিশেষ দক্ষতা ছিল দেশীয় বাদ্যযন্ত্র বাজানোর।

যেমন বাঁশি, কাসি, ঢোল, একতারা, বেহালা, হারমোনিয়াম, তবলা ইত্যাদির বাদ্যযন্ত্র তিনি খুবই সুন্দরভাবে আয়ত্তে এনে ছিলেন। আনুমানিক ১৯৬৩ সাল থেকেই তিনি পূর্ণভাবে সংগীতের সাথে যুক্ত হয়ে যান।শুরুর দিকে তিনি নিজে গান রচনা করতেন না। গানের প্রতি ভালোবাসার টানে অন্য মরমী শিল্পীদের গান গাইতেন। সিলেটের অনেক মরমী কবিদের মধ্যে সৈয়দ শানুর, রাধারমণ দত্ত, হাসন রাজা, আরকুম শাহ, শীতালং শাহ, ইব্রাহীম তশনা, কামাল উদ্দিন, দুর্বিন শাহ, শাহ আব্দুল করিমসহ অনেকের লেখা গান গেয়েছেন তিনি।

ধীরে ধীরে তাঁর শ্রোতাসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। দুর্বিন শাহের আখড়া ক্বারী আমির উদ্দিনের এলাকার কাছে হওয়ায় সেখানে যাতায়াত বেশি ছিল তাঁর। সেই সময় জীবিত বাউল কবিদের মধ্যে দুর্বিন শাহের জনপ্রিয়তা ছিল সর্ব উর্ধ্বে এবং তাঁর রচনা ছিলো জ্ঞানগর্ভ। তিনি জীবনে নিজের রচিত গান ব্যতীত অন্য লোক কবিদের মধ্যে দুর্বিন শাহের গান সব চাইতে বেশি গেয়েছেন। দুর্বিন শাহের গান করেই প্রথমদিকে আলোচনায় আসেন তিনি।ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদ এই পর্যায়ে এসেছেন তাঁর মেধা, শ্রম, সাধনার বিনিময়ে।

ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদের জীবনে দুই সৌভাগ্য নিয়ামক হলেন বাউল সাধক দুর্বিন শাহ ও তুরন মিয়া। তিনি বেশির ভাগ আসরে দুর্বিন শাহের গান করতেন। সিলেট অঞ্চলের অনেক মানুষ বিশ্বাস করতো ক্বারী আমির উদ্দিন দুর্বিন শাহের সন্তান। কিন্তু তাঁর রচনা, শব্দচয়ন,গভীর অর্থবোধক শব্দপ্রয়োগ ইত্যাদিতে দুর্বিন শাহ রচিত গানের প্রভাব ছিলো বেশী। হয়তো এইজন্য মানুষ মনে করত তিনি দুর্বিন শাহের ছেলে। কিন্তু ক্বারী আমির উদ্দিনের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় দুর্বিন শাহের মৃত্যুর পর। অথ্যাৎ দুর্বিন শাহের অভাব তাকে দিয়েই পূরণ করেন গানপ্রিয় মানুষ।

তাই দুর্বিন শাহ ছিলেন ক্বারী আমির উদ্দিনের জন্য এক সৌভাগ্যের নিয়ামক। দ্বিতীয় যে-ব্যক্তির নাম তিনি বাউল, গীতিকার বাউল জগতের এক অভিভাবক ছিলেন। ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পেছনে তুরন মিয়ার রয়েছে অনবদ্য ভূমিকা। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠান, ক্যাসেট নির্মাণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করতেন।

সিলেটের সংগীত অঙ্গনের সুরস্রষ্টা বিদিত লাল দাস ক্বারী আমির উদ্দিনের প্রসংশা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “একজন শুকনো মানুষ, বয়স কম কিন্তু এতো প্রতিভার মিশ্রণ ছিলো যা বলে শেষ করার মতো না। ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদ কে মানুষের মনের গভীরে স্থান করিয়ে দিয়েছিলো মাল জোড়া বা পালা গান। মালজোড়া গানে ক্বারী আমির উদ্দিন ছিলেন বিচক্ষণ। মালজোড়া গানের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী গায়ক হলেন তিনি।

সর্বপ্রথম বাউল মফিজ আলী নামের এক বাউল শিল্পীর সাথে মালজোড়া গান করেন তিনি। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। একে একে তৎকালীন সকল বর্ষীয়ান বাউলদের সাথে মালজোড়া গান করেছেন। তাঁর জীবনে তিনি কোনো মালজোড়া গানে হেরে যাননি, তবে প্রতিপক্ষের বারোটা বাজিয়েছেন কথার মারপ্যাঁচে। উপস্থিত গান রচনার গুণ তাঁর মধ্যে প্রবল ছিলো। মুহূর্তের মধ্যেই গান রচনায় পারদর্শী ছিলেন তিনি।

জীবনে অসংখ্য বিখ্যাত বাউলের সাহচর্য পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। একই আসরে একসাথে গান করেছেন বাউল কামাল উদ্দিন, জ্ঞানের সাগর দুর্বিন শাহ, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম, বাউল মান উল্লাহ, বাউল মিরাজ আলী, বাউল শফিকুন্নুর, বাউল আবেদ আলী, বাউল কফিল উদ্দীন, বাউল আব্দুল হামিদ সরকার,বাউল ছাবুল মিয়া, রজ্জব দেওয়ান ,খালেক দেওয়ান, মালেক দেওয়ান, আব্দুর রহমান বয়াতি,প্রমুখের সঙ্গে। তার আসরে গান করেছেন, শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব, শেফালী ঘোষ। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক গান রচনা করেছেন। বর্তমানে গোলজারে মারিফত বা ‘আমিরি সংগীত’ নামে কয়েক খণ্ডে তাঁর রচিত গান নিয়ে বই প্রকাশিত হয়েছে।

সম্ভবত তিনিই বাউল কবিদের মধ্যে সর্ব্বোচ্চ গানের রচয়িতা,যার সৃষ্টি এখনো পাণ্ডুলিপি এবং বই আকারে বর্তমান বাজারে রয়েছে। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো :

লোকে বলে আমার ঘরে নাকি চাঁদ উঠেছে / না গো না চাঁদ নয় আমার বন্ধু এসেছে।” হেলায় হেলায় কার্য নষ্ট রে”আমার প্রতি ভালোবাসা থাকে যদি মনে / কদমতলায় দেখা দিয়ো বন্ধু কেউ যেন না জানে।

“তোমারে দেখিবার মনে চায় / দেখা দেও আমায় নইলে প্রাণ”

“কে এমন চাঁদরূপসী / জাদুভরা মুখের হাসি” “আগে ভক্তির চুলা বানাও, সবুরের হাঁড়ি বসাও / ভাবের লাকড়িতে জ্বালাও প্রেমেরই চিতা / স্বার্থবাদী প্রেম করে যায় না কভু জিতা।

জগতস্বামী নিজেরে প্রকাশ করিবার তরে / অপূর্ব কৌশলে করেন মানুষ তৈয়ারি / এই মানুষে মানুষে কেন মারামারি।

” বাংলা আমার মায়ের ভাষা বাংলা আমার মা জননী” “আমানতের খেয়ানত হইব রে, ও ভাই কেয়ামতের আলামত আইব রে”/ নৌকা বানাইয়া দিলো সুজন মেস্তরী ময়ুরপঙ্কি নায়ে রে আপন কান্ডারী”/হাছা কথায় শরম করে, মিছা মাতলে আরাম পাই / কি জাতের মুছল্লি আমি কইয়া যাই”

সৈয়দ দুলালসহ অসংখ্য গীতিকার ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদের শীষ্য এবং ছাত্রসংখ্যা সহস্রাধিক।লন্ডনে বসবাস রত অনেক শিল্পী, গীতিকার সরাসরি আমির উদ্দিনের শিষ্য। তাঁর গান গেয়েছেন বাউল পবন দাস,গনি সরকার,আরিফ দেওয়ান, ফকির শাহাবুদ্দিন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, মমতাজ বেগম,বেবী নাজমীন, আসিফ আকবর, শাহনাজ বেলী, কায়া,আশিক,রিন্টু,বাউল কালা মিয়াসহ বিখ্যাত অনেক গায়ক-গায়িকা।

সত্যিকারের বাউলরা প্রচারবিমুখ হন। কে তাদের মূল্যায়ন করলো কে তাদের বিরোধিতা করল সেটা চিন্তা করার সময় তাদের নেই। কারণ ছয় রিপুর ভেদ ভেঙেই তারা এই পর্যায়ে এসেছেন। তারা দেশ ও জাতিকে অনেক দিয়েছেন।এজন্য আমাদেরও উচিত তাদের ন্যূনতম সম্মানটুকু দেয়া। জাতি হিসাবে আমাদের দায় রয়েছে তাঁদের কাছে। তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদকে কোনো পদক বা সম্মান দেয়া হয়নি। এই রকম জীবন্ত গুণী মরমীকে একুশে ও স্বাধীনতা পদক দেয়া কার্পন্য হবে না বলে মনে করেন সংগীতপ্রেমী মহল। এই গুণী বাউল কবি ক্বারী আমির উদ্দিন আহমদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। আজ জন্মদিন উপলক্ষে গ্রামের বাড়ী আলমপুর গ্রামে সমবেত হবেন হাজারো ভক্ত-আশেকান। সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ##

শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির অন্যান সংবাদগুলো