এহসানুল হক জসীম :: কানাইঘাটে জন্মগ্রহণকারী এক শক্তিমান ভাষাবিদ হচ্ছেন ইসমাঈল আলম। কানাইঘাট সদর ইউনিয়নের বাটইশাইল গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এই কৃতিপুরুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় কেটেছে সড়কের বাজার এলাকায়। ১৯৩৭ সালে তিনি মারা যান। তাঁর কবর সড়কের বাজার এলাকায় অবস্থিত। ৩নং দিঘীরপার পুর্ব ইউনিয়নের সাতবাঁক ঈদগাহ প্রাঙ্গনে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন এই ভাষাবিদ। একই কবরস্থানে মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানী খেতাবপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান বীরউত্তমেরও কবর রয়েছে। অনতিদূরে মরহুম জাতীয় নেতা বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল হারিছ চৌধুরীর কবর রয়েছে। গত ১২ এপ্রিল তারিখে সেথায় গিয়েছিলাম। শিপুল আমিন চৌধুরী তখন জানান যে, ভাষাবিদ ইসমাঈল আলমও এই কবরস্থানে শায়িত রয়েছেন। ফলে এই কৃতিমান মানুষেরও কবর দেখা ও জিয়ারত করার সুযোগ হয়। তাঁর সম্পর্কে একটা লেখা পেলাম। সেটা হবহু তুলে ধরছি।
“শাহ মুহাম্মদ আবুল আযীজ ইসমাঈল আলী (১৮৬৮-১৯৩৭) ছিলেন একজন কবি, সুবক্তা, স্বাধীনতা-সংগ্রামী এবং শক্তিমান ভাষাবিদ। তার কাব্যনাম ইসমাঈল আলম। দিওয়ানে আলম কাব্যের জন্য তাঁকে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা থেকে ‘বাংলার তুতা’ খেতাব দেয়া হয়। সঠিক জন্মতারিখ পাওয়া না গেলেও ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দ তার জন্মসাল হিসেবে প্রমাণিত। তাঁর পিতা মাওলানা আব্দুর রহমান নকশবন্দী ছিলেন খ্যাতিমান সূফিপণ্ডিত। ইসমাঈল আলমের পূর্বপূরুষ শাহ তকীউদ্দীন ছিলেন সিলেট-বিজয়ী শাহজালাল-এর অন্যতম সফরসঙ্গী। শাহ তকিউদ্দিনের অধস্তন শাহ জামালউদ্দিন (রহঃ) যিনি ইসমাইল আলম-এর দাদা, সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে তিনি কানাইঘাটের বাটইআইল গ্রামে ইসলাম প্রচার করতে আসেন এবং এখানেই স্থায়ী বসতি গড়েন।
উর্দুভাষী ঐতিহাসিক আবদুল জলিল বিসমিল সিলহেট মে উর্দু গ্রন্থে তার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- “গড়নে তিনি লম্বা, বাদামী রং ও লম্বাটে চেহারা ছিল। ঘন-লম্বাদাড়ি এবং লম্বাহাতের অধিকারী ছিলেন। চলাফেরার সময় নিচের দিকে দৃষ্টি রাখতেন। বেশির ভাগ সময় পায়জামা ও জোব্বা পরতেন। গোলটুপির উপর পাগড়ী বাঁধতেন, খুবই মেহমানদারী করতেন। ছোটবড় সকলের সাথে মিলেমিশে সুফিয়ানাভাবে কথা বলতেন এবং এতে কোন বংশীয়-মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখতেন না। ছিল ছোটছোট গোফ, সুন্দর চোখ, লাজুক চরিত্র। নিভৃতচারীতাকে পছন্দ করতেন। খোশ মেজাজের ওয়ায়েজ ও উচু মাপের বক্তা ছিলেন। সমসাময়িক খ্যাতিমান আলেমদের মধ্যে তিনি একজন, ছিলেন শক্তিমান ভাষাবিধ। ইসমাঈল আলম আরবী, ফার্সি, উর্দু ভাষায় চমৎকার বক্তব্য দিতেন, তার বক্তব্য ছিল শ্রুতিমধুর। ব্রিটিশবিরোধী খেলাফত আন্দোলনে ভুমিকা রাখেন এবং উজ্জীবনী অনেক সঙ্গিত রচনা করেন। তিনি দক্ষতার সাথে বিচারিক কাজ করতেন।”
উঁচুমানের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন তিনি। তার ব্যক্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় একটি বর্ণনা থেকে। সম-সময়ে বিভিন্ন স্থানে গ্রামে গ্রামে (স্থানীয় ভাষায় বলা হতো ঘোরয়-ঘোরয়) ঝগড়া লেগেই থাকতো ৷ তখন দুর-দুরান্ত হতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি উপস্থিত হলে কেউ আর বেয়াদবি করবে না, এবং রক্তারক্তি এড়ানো সম্ভব হবে। কিন্তু শেষ-বয়সে তিনি অন্ধ হয়ে যান এবং চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন, তখন লোকেরা তার লাটি নিয়ে দুই পক্ষের মাঝে রেখে দিত। এমনও হয়েছে, প্রবল উত্তেজনাকর পরিস্তিতিতে বিবদমান গ্রুপের মাধ্যখানে তার লাটি নিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে- তখন লাটির সম্মানার্থে দু-পক্ষই বিবাদ থেকে নিজেদের নিবৃত রেখেছে৷
জীবনের শেষ তেরো বছর অন্ধ ছিলেন। ১৩৪৪ বাংলা, ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে নিভৃতচারী এই মনিষী ইন্তেকাল করেন। তার অছিওত পালনার্থে এবং মুরিদানের ভালবাসার দাবীতে নিজবাড়ী থেকে বিশ কিলোমিটার দূর সড়কেরবাজার (কানাইঘাট) সংলগ্ন ঈদগাহ-গোরস্তানে দাফন করা হয়।”
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।