1. admin@zisantv.com : Alim Uddin : Alim Uddin
রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৩ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজঃ
১৯৭১ কানাইঘাটে যুদ্ধ করে সাহস ও বীরত্বের জন্য যারা বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হন শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের সুযোগ পেল শাহীন আহমদ টেলিভিশন সাংবাদিক ইউনিয়ন বৃহত্তর জৈন্তা’র দ্বিবার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত আনজব আলী (রহঃ) লতিফিয়া হা: ইব: মাদ্রাসার উদ্যোগে ঈদ সামগ্রী বিতরণ আনজব আলী (রহঃ) লতিফিয়া হা: ইব: মাদ্রাসার উদ্যোগে ঈদ সামগ্রী বিতরণ কানাইঘাটের দিঘীরপার পুর্ব ইউপির নাগরিকবৃন্দ’কে দেলওয়ার হোসাইনের ঈদ শুভেচ্ছা কানাইঘাট উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আলিম উদ্দিন আলিমের ঈদ শুভেচ্ছা সিলেট জেলা যুবদলের সহ ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক সাইদুল আলম মাসুমের ঈদ শুভেচ্ছা কানাইঘাট সদর ইউপি চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর ঈদ শুভেচ্ছা ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কানাইঘাট-জকিগঞ্জবাসীকে এম ফরিদ উদ্দিনের শুভেচ্ছা

১৯৭১ কানাইঘাটে যুদ্ধ করে সাহস ও বীরত্বের জন্য যারা বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হন

  • প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৯০ বার পড়েছে

আলিম উদ্দিন আলিম, কানাইঘাট, সিলেট :: পুরো সিলেটকে হানাদারমুক্ত করতে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণের সহায়তা নিয়ে এই অঞ্চলেই মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ পরিচালনা করে বীরত্বের স্বাক্ষর রাখে। কানাইঘাটের মাটিতে (গরিপুর) যুদ্ধ করে সাহস ও বীরত্বের জন্য যারা বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হন।

তারা হলেন- জেড ফোর্সের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম, ৪নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) চিত্তরঞ্জন দত্ত, বীর উত্তম (সি আর দত্ত), ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান, বীর উত্তম, গণ বাহিনীর অধিনায়ক খাঁজা নিজাম উদ্দিন ভুইয়া বীর উত্তম, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট লিয়াকত আলী খান, বীর উত্তম, মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুর রব, বীর উত্তম, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম, আবদুল আজিজ, বীর বিক্রম, শামসুল হক, বীর বিক্রম, মেজর (অব:) ওয়াকার হাসান, বীর প্রতীক, আবুল বশার, বীর প্রতীক, রাসিব আলী, বীর প্রতীক, মোহাম্মদ বজলুল গণি পাটোয়ারী বীর প্রতীক, লেফটেন্যান্ট সাজ্জাদ আলী জহির, বীর প্রতীক

এদিকে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জে নিজের অংশগ্রহণের বিষয়টি গত ৭ এপ্রিল ২০২৬ ইং মহান সংসদে তুলে ধরেন মহান জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। জেড ফোর্সের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মরহুম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও কানাইঘাটে এসেছিলেন যুদ্ধের সময়। তিনি কানাইঘাটের কয়েকটি গ্রামে অবস্থান করেন। জকিগঞ্জে তিনি যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। কানাইঘাটেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান যে খেতাব পান, সেই খেতাব প্রাপ্তিতে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের পাশাপাশি সিলেট শহরে তাঁর যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়টিও মূল্যায়িত হয়।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম :- জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি তারিখে ব্রিটিশ বেঙ্গলের বগুড়া জেলার নশিপুর ইউনিয়নের বাগবাড়ী গ্রামের একটি বাঙালি মুসলিম মণ্ডল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল মনসুর রহমান এবং মাতার নাম ছিল জাহানারা খাতুন ওরফে রানী। পাঁচ ভাইদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয়। তার ডাক নাম ছিলো কমল। ১৯৭১ সালে মেজর জিয়া এবং তার বাহিনী সামনের সারি থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং বেশ কয়েকদিন তারা চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে কৌশলগতভাবে তারা সীমান্ত অতিক্রম করেন। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে প্রথমে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন এবং চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী,রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেনী প্রভৃতি স্থানে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। তিনি সেনা-ছাত্র-যুব সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তীতে ১ম, ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এই তিনটি ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রথম নিয়মিত সশস্ত্র ব্রিগেড জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান, যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল হতে জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং তারপর জুন হতে অক্টোবর পর্যন্ত যুগপৎ ১১ নম্বর সেক্টরের ও জেড-ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সিলেটের জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের যুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

মেজর জেনারেল (অব.) চিত্তরঞ্জন দত্ত, বীর উত্তম (সি আর দত্ত) :- গ্রাম মিরাশি, উপজেলা চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ। বর্তমান ঠিকানা, বাসা-৪৯, সড়ক-২, পুরাতন ডিওএইচএস, বনানী, ঢাকা। বাবা উপেন্দ্রচন্দ্র দত্ত, মা লাবণ্য প্রভা দত্ত। স্ত্রী মনীষা দত্ত। তাঁদের এক ছেলে ও তিন মেয়ে।খেতাবের সনদ নম্বর ০৪। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে ৪ নম্বর সেক্টর ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক এলাকা। এই সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন চিত্তরঞ্জন দত্ত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিরাট অংশ নিয়ে ছিল এই সেক্টর। অধীন এলাকাগুলো হলো সিলেট জেলার কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলা, সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর, দিরাই, শাল্লা উপজেলা এবং মৌলভীবাজার জেলা। ৪ নম্বর সেক্টর এলাকার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয় কানাইঘাটের গরিপুর এলাকায়।

শহীদ ক্যাপ্টিন মাহবুবুর রহমান, বীর উত্তম :- ঈদগাহ বস্তি, দিনাজপুর। বাবা এ এম তাছিরউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, মা জরিনা খাতুন। অবিবাহিত। খেতাবের সনদ নম্বর ২৩। শহীদ ২৬ নভেম্বর ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের সিলেটের কানাইঘাট যুদ্ধ এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কানাইঘাট পাকিস্তানি বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী ২ পক্ষের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল। সীমান্তবর্তী হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী কানাইঘাটে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিল। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী অক্টোবরের শেষ দিকে বুঝতে পারে, কানাইঘাটে যদি পাকিস্তানি বাহিনীর পতন ঘটে তবে সিলেট দখল করা সহজ হবে। ১৫ ও ২২ নভেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ ও আটগ্রাম মুক্ত হয়ে গেলে কানাইঘাট মুক্ত করাই মুক্তিবাহিনীর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বাধীন আলফা কোম্পানি ও ডেল্টা কোম্পানি রেখে পিছনে ব্রাভো ও চার্লি কোম্পানি নিজেদের প্রতিরক্ষা অবস্থান নেয়। তুমুল গোলাগুলির মধ্যে হঠাৎ পাকিস্তানিদের ছোড়া একটি শেল ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমানের  শরীরে লাগে। তিনি শহীদ হন। এই যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল মুক্তিবাহিনী।

শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া, বীর উত্তম :- ৩ সেপ্টেম্বর খাজা নিজামউদ্দিন ভূঁইয়া কানাইঘাটের নক্তিপাড়া গ্রামের কালাহাজীর বাড়িতে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কানাইঘাটের কটালপুর ব্রিজ মুক্ত করার পরিকল্পনা করেন। ঠিক হয় ৪ সেপ্টেম্বর ধ্বংস করা হয় কটালপুর ব্রিজ। সেই সময় গুলিবিদ্ধ হয়েও একটানা গুলি চালিয়ে যেতে লাগলেন তিনি। এসময় আরেকটি গুলি এসে লাগে খাজা নিজামউদ্দিন ভূঁইয়ার শরীরে। আর পারলেন না খাজা নিজামউদ্দিন ভূঁইয়া। ঢলে পড়লেন বাংলার মাটিতে শেষবারের মতো। শহীদ হলেন খাজা নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে খাজা নিজামউদ্দিন ভূঁইয়া এতোটাই অসীম নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন যে কানাইঘাটের স্থানীয়রা সবাই সামরিক বাহিনীর অফিসার হিসেবেই মনে করতো।শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়াকে সমাহিত করা হয় কানাইঘাটের বড়খেয়ড় গ্রামে।

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট লিয়াকত আলী খান, বীর উত্তম :- লিয়াকত আলী খানের জন্ম বাগেরহাট জেলার বাগেরহাট পৌরসভার অন্তর্গত সরাই রোডের আমলাপাড়ায়। তার বাবার নাম আতাহার আলী খান এবং মায়ের নাম আজিজা খাতুন। তার স্ত্রীর নাম নাজমা আনোয়ার বেগম। তাদের এক মেয়ে, এক ছেলে। ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধকালের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ঘটে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার গৌরীপুরে। জৈন্তাপুরজকিগঞ্জ সড়কে সুরমা নদীর তীরে ছিলো থানা সদরের অবস্থান। অবস্থানগত কারণে ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী উভয়ের কাছেই কানাইঘাট ছিল সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কানাইঘাটে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্ত এক অবস্থান। তখন কানাইঘাটের অগ্রবর্তী এলাকা জকিগঞ্জ, আটগ্রাম, চারগ্রাম মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। জকিগঞ্জ, আটগ্রাম, চারগ্রাম দখলের পর মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যেতে থাকেন সিলেট অভিমুখে। মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলে ছিলেন লিয়াকত আলী খান। ২৫ নভেম্বর তারা কানাইঘাট থানা সদরের দুই মাইল অদূরে গৌরীপুরে পৌঁছেন। কানাইঘাটে আক্রমণের উদ্দেশ্যে তারা গৌরীপুরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। মুক্তিযোদ্ধা দলের অধিনায়ক ছিলেন মাহবুবুর রহমান (বীর উত্তম)। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে সহযোদ্ধাদের নিয়ে আক্রমণ মোকাবিলা করছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শাহাদতবরণ করেন। এ অবস্থায় লিয়াকত আলী খান যুদ্ধক্ষেত্রে অধিনায়কের দায়িত্ব পান।

মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুর রব, বীর উত্তম :- তিনি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার খাগাউড়া গ্রামে ১৯১৯ সালের ১লা জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনীর চিফ অব স্টাফ এবং মুজিবনগর সরকারের পূর্বাঞ্চলের বেসামরিক প্রশাসক ছিলেন। সাহসিকতার জন্য তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাব (সনদ নং ০১) এবং মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক (২০০০) লাভ করেন।১ ডিসেম্বর জেড ফোর্সের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমান তাঁর প্রথম ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যদের অগ্রসর হওয়ার স্বার্থে ৪ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের কানাইঘাট দখলের জন্য আবারও অনুরোধ বার্তা পাঠান। সেদিন বিকেল পাঁচটায় ৪ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত ক্যাপ্টেন আবদুর রবকে পরদিন ভোরেই কানাইঘাট আক্রমণের আদেশ দেন। ক্যাপ্টেন আবদুর রব মেজর চিত্তরঞ্জনকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, তাঁর অধীন মুক্তিযোদ্ধারা তিন রাত ধরে নিঘু‌র্ম অবস্থায় রয়েছেন এবং তাঁরা প্রচণ্ড রকমের ক্লান্ত। এ ছাড়া এই কয়েক দিনের যুদ্ধের ফলে গোলাবারুদও কিছুটা কমে গিয়েছিল। এই ঘাটতি পূরণ করাটাও জরুরি। ৪ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক চিত্তরঞ্জন দত্ত ক্যাপ্টেন রবের পরামর্শ উপেক্ষা করেন। তিনি যেটুকু শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে, তা নিয়েই কানাইঘাট দখলের জন্য ক্যাপ্টেন আবদুর রবকে নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ পেয়েই কানাইঘাটের গরিপুরসহ চা বাগান এলাকা শত্রুমুক্ত করতে সাহসী ভুমিকা পালন করেন।

মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম :- লালমোহন, ভোলা। বর্তমান ঠিকানা বাড়ি কে-২১, সড়ক ২৭, বনানী, ঢাকা। বাবা আজহার উদ্দিন আহম্মদ, মা করিমুন্নেছা। স্ত্রী দিলারা হাফিজ। তাঁদের এক মেয়ে ও দুই ছেলে। খেতাবের সনদ নম্বর ১০। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ দলনেতা (কোম্পানি কমান্ডার) হিসেবে বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। এর মধ্যে সহযোদ্ধাদের নিয়ে সাহসের সঙ্গে পাকিস্তানি আক্রমণ প্রতিরোধ করেন। এরপর ভারতে যান। সেখানে পুনরায় সংগঠিত হয়ে তিনি জকিগঞ্জের চারগ্রাম ও আটগ্রাম দখলের পর কানাইঘাটের গরিপুর যুদ্ধ শেষ করে সিলেট এমসি কলেজের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

আবদুল আজিজ, বীর বিক্রম :- তিনির পৈতৃক বাড়ি মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার মাঝকান্দি গ্রামে। তাঁর বাবার নাম খলিল মোল্লা এবং মায়ের আমিরুন নেছা। তাঁর স্ত্রীর নাম মোরশেদা বেগম। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে বৃহত্তর সিলেট জেলায় একের পর এক যুদ্ধ করেন আবদুল আজিজ ও তাঁর সহযোদ্ধারা। ধলই, পাত্রখোলা, চারগ্রাম, কানাইঘাটের গরিপুর প্রভৃতি স্থানে একটানা যুদ্ধ করে পরিশ্রান্ত হলেও তাঁদের যুদ্ধ করার আগ্রহে ভাটা পড়েনি, বরং আরও বেড়ে যায়। কারণ, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে।
নভেম্বরে কানাইঘাট দখলের পর আবদুল আজিজ ও তাঁর সহযোদ্ধারা রওনা হন সিলেট শহর অভিমুখে। তাঁরা ছিলেন কয়েকটি দলে (কোম্পানি) বিভক্ত। তাঁদের দলনেতা ছিলেন ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম, পরে মেজর)। সব দলের সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ (বীর উত্তম)।

শামসুল হক, বীর বিক্রম :- শামসুল হকের জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার জিনোদপুর ইউনিয়নের বলিবাড়ি গ্রামে। তার বাবার নাম সৈয়দ আলী মুন্সি এবং মায়ের নাম নূরেন্নেছা বেগম। তার স্ত্রীর নাম আফিয়া বেগম। তাদের চার ছেলে দুই মেয়ে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সিলেট জেলার অন্তর্গত কানাইঘাট এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্ত এক অবস্থান ছিল। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থানে আক্রমণ করে। তখন সেখানে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ছোট দলের নেতৃত্বে ছিলেন শামসুল হক। কানাইঘাট ছিল মুক্তিবাহিনীর ৪ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন এলাকা। সেক্টর অধিনায়ক ছিলেন সি আর দত্ত (বীর উত্তম)। শামসুল হক ও তার সহযোদ্ধারা রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে অবস্থান নিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের কাছে। মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি দলে বিভক্ত। একটি দলের নেতৃত্বে শামসুল হক। বিরামহীন ও ভয়াবহ গোলাবর্ষণ চলতে থাকে।শামসুল হক মনোবল হারালেন না। চরম প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সহযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করে এগিয়ে যেতে থাকলেন সামনে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়ে বিপুল বিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকলেন। তাদের সাহসিকতায় পাকিস্তানি সেনারা হতবাক হয়ে পড়ে। ‘কানাইঘাট যুদ্ধে পাকিস্তানিদের মৃতের সংখ্যা ছিল ৫০ জন। আহত ২০ জন। মুক্তিযুদ্ধাদের পক্ষে শহীদ হয়েছে ১১ জন। আহত হয়েছিল ১৫ জন।

মেজর (অব:) ওয়াকার হাসান, বীর প্রতীক :- ওয়াকার হাসানের জন্ম ঢাকায়। তার বাবার নাম এ এইচ এম হাবিবুল ইসলাম এবং মায়ের নাম শামসুন নাহার। তার স্ত্রীর নাম মাহমুদা আক্তার। এ দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর সিলেট জেলার কানাইঘাটের গরিপুর এলাকা। এই যুদ্ধে ওয়াকার হাসান অসাধারণ নৈপুণ্য ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। পাঞ্জাব রেজিমেন্টের প্রায় ৮৮ জন সৈন্য যুদ্ধে নিহত এবং ২৬ জন বন্দী হয়। কানাইঘাটে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্ত একটি ঘাঁটি। ২৪-২৫ নভেম্বর সেখানে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিল প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কয়েকটি কোম্পানির সমন্বয়ে গড়া মুক্তিবাহিনীর একটি বড় দল। মুক্তিবাহিনীর ডেলটা কোম্পানির ১২ নম্বর প্লাটুনের কমান্ডার ছিলেন ওয়াকার হাসান। কানাইঘাটের চারপাশে বেশ কয়েকটি গ্রাম- গৌরীপুর, বড় চাতাল, ডালিয়ার চর প্রভৃতি। উত্তর-পূর্বে আন্দু বিল নামে একটি ছোট বিল। মাঝ দিয়ে বহমান সুরমা নদী। ২৪-২৫ নভেম্বরেও পাকিস্তানিরা গৌরীপুরে অতর্কিতে মুক্তিবাহিনীর আলফা কোম্পানির ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। তখন সেখানে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

আবুল বশার, বীর প্রতীক :- আবুল বশারের পৈতৃক বাড়ি গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম আবদুর রাজ্জাক এবং মায়ের নাম আঞ্জুমান নেছা। তার স্ত্রীর নাম সাহেদা বেগম। তাদের এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বরের সিলেটের কানাইঘাটের গৌরীপুরে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়। কয়েক দিন ধরে আবুল বশার ও তার সহযোদ্ধারা যুদ্ধ-উন্মাদনায়। একটানা বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করেছেন। শত্রুর আকস্মিক আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা হকচকিত। তবে দ্রুত তারা নিজেদের সামলিয়ে নেন। যে যেভাবে পারেন পাকিস্তানি আক্রমণ মোকাবিলা শুরু করেন। আক্রমণকারী পাকিস্তানি সেনারা ছিল বেপরোয়া ও অপ্রতিরোধ্য। জীবনের মায়া তাদের ছিল না। মরিয়া মনোভাব নিয়ে তারা আক্রমণ করে। এ রকম অবস্থায় সম্মুখযুদ্ধ ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। আবুল বাশারসহ মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে আক্রমণ প্রতিরোধ করেন। কিন্তু বিপুল বিক্রমে যুদ্ধ করেও পাকিস্তানিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ব্যর্থ হন। ফলে তারা চরম নাজুক অবস্থায় পড়েন। শহীদ ও আহত হন আবুল বশারের কয়েকজন সহযোদ্ধা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে তার অধিনায়ক মাহবুবুর রহমান (বীর উত্তম) শহীদ হন। পরবর্তী অধিনায়ক লিয়াকত আলী খান (বীর উত্তম) গুরুতর আহত হন। এতে বাশার দমে যাননি। জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন।

রাসিব আলী, বীর প্রতীক :- গ্রাম বাদে দেউলি, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট। বাবা হোসেন আলী, মা খুরশেদা বিবি। স্ত্রী ময়নু বেগম। তাঁদের দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। খেতাবের সনদ নম্বর ৬২। মৃত্যু ১৯৯৬। ১৯৭১ সালে তিনিসহ অনেক বাঙালি ইপিআর সদস্য কর্মরত ছিলেন ঢাকার গভর্নর হাউসে (বর্তমান বঙ্গভবন)। ২৬ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বালুচ রেজিমেন্টের একটি দল তাঁদের ঘেরাও করে অস্ত্র জমা দিতে বলে। কিন্তু তাঁরা অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকার করেন। পরে বাঙালি সুবেদারের নির্দেশে তাঁরা অস্ত্র জমা দেন। ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হলে বেশির ভাগ বাঙালি ইপিআর সদস্য গভর্নর হাউস থেকে পালিয়ে যান। রাসিব আলীও পালাতে সক্ষম হন। বাড়ি ফিরে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ করেন মুক্তিবাহিনীর ৪ নম্বর সেক্টরের বড়পুঞ্জি সাব-সেক্টর এলাকায়। যুদ্ধকালীন সময়ে কানাইঘাট থানা আক্রমণে তিনি আহত হন।

মোহাম্মদ বজলুল গণি পাটোয়ারী, বীর প্রতীক :- মো. বজলুল গনি পাটোয়ারী, বীর প্রতীক খেতাবের সনদ নম্বর ৮। গ্রাম মদনগাঁও, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর। বর্তমান ঠিকানা মহাখালী ডিওএইচএস, ঢাকা। বাবা আবদুর রহিম পাটোয়ারী, মা আফিয়া খাতুন।স্ত্রী লায়লা পারভীন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মো. বজলুল গণি পাটোয়ারী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে সীমান্ত এলাকা কানাইঘাট থেকে যুদ্ধ শেষ করে অগ্রসরমাণ মুক্তিযোদ্ধারা ১৩ ডিসেম্বর রাতে সিলেট শহরের উপকণ্ঠে এমসি কলেজসংলগ্ন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থানের মুখোমুখি হন। মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানের ৫০০ গজ দূরে টিলার ওপর। কানাইঘাট ও সিলেটের মুক্তিযোদ্ধাদের ‘ডি’ (ডেলটা) কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন মো. বজলুল গণি পাটোয়ারী।

লেফটেন্যান্ট সাজ্জাদ আলী জহির, বীর প্রতীক :- গ্রাম চৌসই, দাউদকান্দি, কুমিল্লা। বর্তমান ঠিকানা বাসা ৫, সড়ক ৫৫, গুলমান ২, ঢাকা।বাবা কাজী আবদুল মুত্তালিব, মা নূরুন্নাহার বেগম।স্ত্রী খালেদা মরিয়ম সাজ্জাদ। তাঁদের এক মেয়ে ও এক ছেলে।খেতাবের সনদ নম্বর ২৪। গেজেটে নাম কাজী সাজ্জাদ আলী জহির। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সিলেট অঞ্চলে ৪ নম্বর সেক্টরের অধীনে দ্বিতীয় গোলন্দাজ বাহিনীকে সংগঠিত করেন। আগস্ট মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে কমিশন লাভ করেন সাজ্জাদ আলী জহির। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন সেপ্টেম্বরে মাসে। এ সময় ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীকে কয়েকটি ১০৫ এমএম গান দেয়। তা দিয়ে মুক্তিবাহিনীর জন্য একটি ফিল্ড আর্টিলারি ব্যাটারি গঠন করা হয়। এর নাম দেওয়া হয় রওশন আরা ব্যাটারি। এই ব্যাটারিতে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি। এ গ্রুপের সহঅধিনায়ক ছিলেন তিনি। রওশন আরা ব্যাটারিতে ছিল ছয়টি গান। অক্টোবর মাস থেকে এই ব্যাটারি ১০৫ এমএম কামান দিয়ে কানাইঘাটের গরিপুর সহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সকে বিভিন্ন যুদ্ধে আর্টিলারি ফায়ার সাপোর্ট দিয়ে সহায়তা করে। সাজ্জাদ জহিরের পরিচালনায় রওশন আরা ব্যাটারি কয়েকবার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানে গোলাবর্ষণ করে। সঠিক নিশানায় গোলাবর্ষণ করার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট কৃতিত্ব ও দক্ষতা প্রদর্শন করেন।

শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির অন্যান সংবাদগুলো