মো. মোস্তফা মিয়া :: সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে “পুশ-ইন” এর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিনা আইনি প্রক্রিয়ায়, বিনা যাচাইয়ে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া জাতিসংঘের ICCPR সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সনদের চরম লঙ্ঘন। তবে আশার কথা হলো, বিজিবি এবং সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের কঠোর প্রতিরোধের ফলে এখন “পুশ-ইনকে পুশ-ব্যাক” করা হচ্ছে। এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। সীমান্ত রক্ষা মানে শুধু সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নয়, এটি এখন জনগণের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। নিম্নোক্ত বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি করা আবশ্যক।
১. পুশ-ইন: আইন ও মানবতার লঙ্ঘন: “পুশ-ইন” বলতে বোঝায় – কোনো দ্বিপাক্ষিক যাচাই, Flag Meeting বা আইনি শুনানি ছাড়াই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে প্রতিবেশী দেশে ঠেলে দেওয়া। 2024-2025 সালে বিএসএফ রাতের আঁধারে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ কয়েকশো মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। ভারত 1979 সালে ICCPR অনুসমর্থন করেছে। পুশ-ইনের মাধ্যমে সনদের একাধিক ধারা লঙ্ঘিত হচ্ছে:
অনুচ্ছেদ ৯ : স্বেচ্ছাচারী আটক নিষিদ্ধ। বিনা ওয়ারেন্টে আটক করে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অনুচ্ছেদ ১২ ও ১৩ : আইনসম্মতভাবে অবস্থানকারীকে বহিষ্কারের আগে শুনানি ও আপিলের সুযোগ দিতে হবে। পুশ-ইনে এই সুযোগ নেই।
অনুচ্ছেদ ৭: অমানবিক আচরণ নিষিদ্ধ। পরিবার বিচ্ছিন্ন করে রাতের বেলায় কাঁটাতারে ফেলে দেওয়া মানসিক নির্যাতনের শামিল।
এছাড়া 2011 সালের Coordinated Border Management Plan – CBMP চুক্তিতেও স্পষ্ট বলা আছে, সীমান্তে কাউকে পুশ-ইন করা যাবে না। সন্দেহ হলে যৌথভাবে যাচাই করে ফেরত পাঠাতে হবে। ভারত নিজের স্বাক্ষর করা চুক্তি নিজেই ভাঙছে।
২. বিজিবি ও জনতার প্রতিরোধ: “পুশ-ইনকে পুশ-ব্যাক”: পুশ-ইনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ নীরবে বসে নেই। বিজিবি এবং সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের কঠোর প্রতিরোধের ফলে এখন চিত্র বদলেছে।
বিজিবির ভূমিকা: বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এখন “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণ করেছে। বিএসএফ যখনই রাতের আঁধারে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে, বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দেয়। ড্রোন, নাইট ভিশন ক্যামেরা ও আধুনিক নজরদারির মাধ্যমে সীমান্ত মনিটরিং করা হচ্ছে। পুশ-ইনের প্রতিটি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষণ করে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।
জনগণের প্রতিরোধ: সবচেয়ে গৌরবের দিক হলো সীমান্তবর্তী গ্রামের মানুষের জেগে ওঠা। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুরের গ্রামবাসী এখন রাত জেগে পাহারা দেয়। বিএসএফ পুশ-ইন করতে এলে গ্রামের মাইকে ঘোষণা হয়, হাজার হাজার মানুষ লাঠি নিয়ে সীমান্তে জড়ো হয়। এই জনপ্রতিরোধের মুখে বিএসএফ বাধ্য হয়ে “পুশ-ইনকে পুশ-ব্যাক” করতে। অর্থাৎ যাদের ঠেলে দেওয়া হয়, তাদের আবার ভারতের দিকেই ফেরত পাঠানো হয়।
এই প্রতিরোধ শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়, এটি দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক – সবাই বুঝেছে বাংলাদেশের মাটি কারও ডাম্পিং গ্রাউন্ড নয়। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণই সবচেয়ে বড় শক্তি। 1971 সালে যেমন জনগণ অস্ত্র হাতে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, আজ তেমনি জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে সীমান্তের অখণ্ডতা রক্ষা করছে।
৩. মানবিক ও কৌশলগত প্রভাব: পুশ-ইন বন্ধ করতে পারলে বাংলাদেশ তিনটি সংকট থেকে বাঁচবে।
মানবিক সংকট: হঠাৎ করে আসা মানুষের থাকা-খাওয়ার চাপ কমবে। আমরা ইতোমধ্যে 12 লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। নতুন বোঝা নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত।
আইনি সংকট: রাষ্ট্রহীন মানুষ তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ হবে। যাদের জাতীয়তা অনিশ্চিত, তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হবে না।
নিরাপত্তা সংকট: সীমান্তে অস্থিরতা কমবে। প্রকৃত অপরাধী চোরাকারবারিরা বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিতে পারবে না।
বিজিবি-জনতার যৌথ প্রতিরোধ প্রমাণ করেছে, সীমান্ত রক্ষা শুধু বাহিনীর কাজ নয়। জনগণ পাশে থাকলে কোনো শক্তিই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারবে না।
৪. বাংলাদেশের করণীয়: এই প্রতিরোধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। যেমন- ক. কূটনৈতিক চাপ: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতকে স্পষ্ট জানাতে হবে – পুশ-ইন চলতে থাকলে CBMP চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা হবে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে পুশ-ইনের ভিডিও ফুটেজ জমা দিতে হবে।
খ. জনসচেতনতা: সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। “সীমান্ত রক্ষা কমিটি” গঠন করে তাদের আইনি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
গ. প্রযুক্তিগত সক্ষমতা: বিজিবির জন্য আরও ড্রোন, থার্মাল ক্যামেরা ও নজরদারি টাওয়ার বরাদ্দ দিতে হবে।
ঘ. মানবিক সহায়তা: পুশ-ইনের শিকার হয়ে যারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে, তাদের প্রাথমিক মানবিক সহায়তা দিয়ে দ্রুত পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
৫. প্রতিবেশী সম্পর্কের ভবিষ্যৎ: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক “সোনালী অধ্যায়” পার করছে – এমন কথা আমরা শুনি। বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগে সহযোগিতা বাড়ছে। কিন্তু পুশ-ইন এর মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন সেই সোনালী অধ্যায়কে ম্লান করে দিচ্ছে।
প্রতিবেশী সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আইনের শাসন। একতরফা সিদ্ধান্ত, মানুষ ঠেলে দেওয়া দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্ব টেকে না। ভারতকে বুঝতে হবে – বাংলাদেশ দুর্বল নয়। বিজিবি আছে, জনগণ আছে। পুশ-ইন করলে পুশ-ব্যাক হবে।
পুশ-ইন একটি কূটনৈতিক সমস্যা মাত্র নয়, এটি সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। জাতিসংঘের ICCPR লঙ্ঘন করে কোনো রাষ্ট্র দায়মুক্তি পেতে পারে না।
তবে এই সংকটের মধ্যে একটি আশার আলো দেখা যাচ্ছে – বিজিবি ও সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। “পুশ-ইনকে পুশ-ব্যাক” করার ঘটনা প্রমাণ করেছে, দেশপ্রেম মরে যায়নি। সীমান্তের কৃষক যখন লাঠি হাতে রাত জাগে, তখন বোঝা যায় ১৯৭১-এর চেতনা এখনও বেঁচে আছে।
বাংলাদেশ চায় প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে সমতার ভিত্তিতে, আইনের শাসনের ভিত্তিতে। পুশ-ইন বন্ধ করুন। সংলাপের টেবিলে আসুন। আর মনে রাখুন – বাংলাদেশের মাটি রক্ষার জন্য বিজিবি একা নয়, ১৮ কোটি মানুষ জেগে আছে।এটাই দেশপ্রেম। এটাই বাংলাদেশ।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও এনজিও ব্যক্তিত্ব